নারীর নিরাপত্তা ও নেতৃত্বে রাজনীতি বদলানোর ডাক: প্রতিটি দলে আচরণবিধি থাকা উচিত—জাইমা রহমান
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই প্রশ্ন আরও গভীর ও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে নারীর নেতৃত্ব, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা আবারও সামনে আনল রাজধানীতে অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল আলোচনা।
রাজনীতিতে সক্রিয় নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের জন্য বাধ্যতামূলক আচরণবিধি (Code of Conduct) থাকা উচিত—এমন মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান। তাঁর এই বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।
‘গণতন্ত্রের সংগ্রামে নারী’—গোলটেবিল আলোচনার প্রেক্ষাপট
রোববার রাজধানীর বিস মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘গণতন্ত্রের সংগ্রামে নারী: অবদান ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক। আলোচনাটির আয়োজন করে উইমেন ইন ডেমোক্রেসি (WIND)—একটি নারী নেতৃত্ব ও গণতন্ত্রকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্ম।
এই আলোচনায় রাজনীতি, আইন, শ্রম আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ছাত্র আন্দোলন ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মূল আলোচনার কেন্দ্রে ছিল—
👉 নারীর রাজনৈতিক নিরাপত্তা
👉 নেতৃত্বে নারীর অবস্থান
👉 নির্বাচন ও গণতন্ত্রে নারীর ভবিষ্যৎ
জাইমা রহমান: ‘নারী রাজনীতিবিদদের নিরাপত্তা দলের দায়িত্ব’
গোলটেবিলে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জাইমা রহমান বলেন, রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে আগে তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন—
“যদি কোনো নারী নেত্রী বা স্টুডেন্ট লিডারের নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা হয়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোকে লিগ্যাল কোড অব কনডাক্টের মাধ্যমে তাঁকে প্রটেক্ট করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন,
নারীর সঙ্গে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দল যেন দায়িত্ব নেয়—এই নিশ্চয়তা না থাকলে নারীদের রাজনীতিতে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
নারীদের জন্য রাজনীতি কেন কঠিন—জাইমার বিশ্লেষণ
লন্ডনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে জাইমা রহমান বর্তমানে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যুক্ত। আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তিনি বাবার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।
এই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন,
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুরুষদের জন্য জায়গা করে নেওয়া তুলনামূলক সহজ হলেও নারীদের জন্য সেটি অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।
তার ভাষায়—
“নারীদের এগিয়ে আনতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রশিক্ষণ, সহায়তা ও মেন্টরশিপের দায়িত্ব নিতে হবে।”
তিনি একটি উপমা টেনে বলেন,
“ছায়া না থাকলে ছোট গাছ বড় হয় কীভাবে?”
নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছাড়া নেতৃত্ব অসম্ভব
শুধু নিরাপত্তা নয়, নারীদের অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও জোর দেন জাইমা রহমান। তিনি বলেন—
“যাঁদের মেধা আছে, তাঁদের সংসদীয় আসন বা স্থানীয় সরকারে দাঁড়ানোর সুযোগ দেওয়া উচিত।”
তার মতে, রাজনৈতিক দলে নারীদের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর সুযোগ না দিলে কেবল বক্তৃতা দিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়।
ফারাহ কবিরের প্রশ্ন: ‘নারীরা কি এখন ফিরে যাবে?’
গোলটেবিলে অংশ নিয়ে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির নারীদের নেতৃত্ব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন,
গত ১৮ মাসে এমন একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যেখানে নারীদের ধীরে ধীরে নেতৃত্বের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ফারাহ কবিরের প্রশ্ন—
“নারীরা কি এখন সবাই ফিরে যাবে?”
তিনি বলেন, এটি আসলে ডিভাইড অ্যান্ড রুল কৌশলের অংশ, যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর।
নির্বাচন মানেই সিদ্ধান্তের সময়
ফারাহ কবিরের মতে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শুধু ক্ষমতার প্রশ্ন নয়—এটি কী ধরনের নেতৃত্ব চায় দেশবাসী, সেই সিদ্ধান্তের সময়।
তিনি বলেন,
নারীদের রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার যে ‘নোংরা সংস্কৃতি’ রয়েছে, সেটির অবসান ঘটাতে নারীদেরকেই সামনে আসতে হবে।
একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, অতীতে রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের এগিয়ে আনার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখেনি।
সারা হোসেন: প্রতিশ্রুতি আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের রূপরেখা নেই
আইনজীবী সারা হোসেন আলোচনায় বলেন, জুলাই সনদ ও গণভোটে বৈষম্য নিরসনের কথা বলা হলেও, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের স্পষ্ট রূপরেখা নেই।
তিনি আরও বলেন,
কিছু নারী সম্প্রতি প্রকাশ্যে বলেছেন—তাঁরা পুরুষের অধীন থাকতে চান। এই ধরনের বক্তব্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা উচিত, যাতে এগুলো স্বাভাবিকীকরণ না হয়।
সারা হোসেন সতর্ক করে বলেন,
স্বৈরাচারের দোহাই দিয়ে বিদ্যমান আইনগুলো বাতিল করার প্রবণতা বিপজ্জনক হতে পারে।
অনলাইন ও অফলাইনে নারীর ওপর হয়রানি বেড়েছে
আইনজীবী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা বলেন,
গত ১৮ মাসে নারীরা সবচেয়ে বেশি এগিয়ে এসেছে একটি খেলায়—আত্মরক্ষার খেলায়।
তার মতে,
অনলাইন ও অফলাইনে নারীদের স্লাটশেমিং, অপমান ও হয়রানি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে।
‘নারীরা পিছু হটবে না’—কল্পনা আক্তারের বার্তা
শ্রমিক নেতা কল্পনা আক্তার বলেন,
“যতবার নারীদের পেছানোর চেষ্টা করা হবে, নারীরা ততবার লড়ে যাবে।”
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, যেই সরকারই আসুক না কেন, তারা যেন নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়।
সমান অধিকারের পরিবেশ এখনও নেই—লুৎফা হাসান রোজি
মুক্তিযোদ্ধা লুৎফা হাসান রোজি বলেন,
বাংলাদেশের সমাজে সমান অধিকারের জন্য প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।
এই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে নারীদেরই সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গণ–অভ্যুত্থানের পর নারীদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ
ৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক উমামা ফাতেমা বলেন,
গণ–অভ্যুত্থানে যেসব নারী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, পাঁচ আগস্টের পর তাঁদের অনেককেই উপেক্ষা করা হয়েছে।
তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলো এখন নারীদের বিভিন্নভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিশ্লেষণ: রাজনীতিতে নারীর নিরাপত্তা কেন এখন বড় ইস্যু
বিশ্লেষকদের মতে,
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্র কখনোই পূর্ণতা পায় না।
জাইমা রহমানের আচরণবিধির প্রস্তাব রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে একটি নতুন চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ তৈরি করেছে—
👉 তারা কি বাস্তব পরিবর্তনে যাবে,
নাকি বিষয়টি আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
শেষ কথা
নারীর নিরাপত্তা, নেতৃত্ব ও সম্মান—এই তিনটি বিষয় এখন আর আলাদা নয়।
জাইমা রহমানের বক্তব্য এবং গোলটেবিল আলোচনার অভিমত স্পষ্ট করে দিয়েছে—
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নারীরা কতটা নিরাপদ ও ক্ষমতাবানভাবে রাজনীতিতে থাকতে পারেন, তার ওপর।
আসন্ন নির্বাচন সেই পরীক্ষারই একটি বড় মঞ্চ।


