আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সিলেটে জনসভা থেকে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা দিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি ঘোষণা দেন, “আগামী ১২ তারিখ নতুন ইতিহাস হবে, ইনশা আল্লাহ”—যাকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শনিবার বিকেলে সিলেট নগরের সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জেলা ও মহানগর জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম।
‘জামায়াতের নয়, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই’
বক্তব্যের শুরুতেই শফিকুর রহমান বলেন,
“আমি জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, আমি এই দেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই।” তিনি বলেন, ১২ তারিখের পর ১৩ তারিখ যে সূর্য উঠবে, সেই সূর্যের আলোয় একটি নতুন বাংলাদেশ দেখতে চান তিনি।
এই বক্তব্যকে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
১১-দলীয় ঐক্য ক্ষমতায় এলে ‘দেশের চেহারা বদলে যাবে’
১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে ব্যাপক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জামায়াত আমির বলেন,
“৫৪ হাজার বর্গমাইলের এক ইঞ্চি জমিতেও বেইনসাফি হবে না। দুর্নীতি আর চাঁদাবাজির রুট বন্ধ হলে পাঁচ বছরের মধ্যেই দেশের চেহারা পাল্টে যাবে।”
তিনি দাবি করেন, যুবসমাজ ও মা-বোনেরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন, সেই বাংলাদেশ বাস্তবে হাতে ধরা দেবে।
সিলেটকে নিয়ে বিশেষ প্রতিশ্রুতি
সিলেটবাসী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের খনিজ সম্পদ থেকে বঞ্চিত—এমন অভিযোগ তুলে ধরে শফিকুর রহমান বলেন, ক্ষমতায় গেলে এই বঞ্চনা থাকবে না।
তিনি জানান—
- সুপেয় পানি ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে
- ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে নামে নয়, কাজে পূর্ণাঙ্গ করা হবে
- সব আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট নামানোর ব্যবস্থা করা হবে
প্রবাসী রুট চালু ও মরদেহ দেশে আনার প্রতিশ্রুতি
বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত সিলেটি প্রবাসীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ম্যানচেস্টার ছিল গুরুত্বপূর্ণ হাব। সেই রুট বন্ধ কেন থাকবে?”
জামায়াত ক্ষমতায় এলে বন্ধ রুট পুনরায় চালু করা হবে এবং নতুন নতুন রুট খোলা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এছাড়া কোনো প্রবাসী মৃত্যুবরণ করলে তাঁর মরদেহ রাষ্ট্রীয় খরচে দেশে আনার ঘোষণাও দেন জামায়াত আমির।
অর্থ পাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি
বিগত ৫৪ বছরে সব শাসনামলেই দুর্নীতি হয়েছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, “শুধু ফ্যাসিবাদী সাড়ে ১৫ বছরে সাড়ে ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। এই টাকা ১৮ কোটি মানুষের।”
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দায়িত্ব পেলে জনগণের টাকা লুটকারীদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না।
চাঁদাবাজি, ঘুষ ও সন্ত্রাস বন্ধের অঙ্গীকার
সিলেটে মদ, গাঁজা, অস্ত্র ও সন্ত্রাসের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন,ক্ষমতায় গেলে আর কেউ চাঁদাবাজির সাহস পাবে না।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে। এরপর কেউ অপরাধ করলে অবশ্যই তার বিচার হবে।
নদী, হাওর ও কৃষিকে গুরুত্ব
নদী রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, “সুরমা-কুশিয়ারা যেন শুধু বইয়ের পাতায় না থাকে, বাস্তবে জীবন্ত নদী হিসেবে ফিরে আসে।”
সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় ফসল রক্ষাকারী বাঁধ নির্মাণে কোনো দুর্নীতি হবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি এছাড়া কৃষিপ্রধান এলাকায় ‘কৃষি রাজধানী’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান।
সিলেটের শিক্ষা ও চা-জনগোষ্ঠী
সিলেটের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের উন্নয়ন না হওয়ার সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, দায়িত্ব পেলে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর উন্নয়ন করা হবে।
পাশাপাশি চা-জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
সমাবেশে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা রেজাউল করীম জালালী, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধানসহ ১১-দলীয় ঐক্যের নেতারা।
সমাবেশ শেষে সিলেট ও সুনামগঞ্জের বিভিন্ন আসনের প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দেন জামায়াত আমির এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।


